গঙ্গাতীরে ঐতিহ্য ও সাধনার মিলনভূমি, পঞ্চসতীর তীর্থক্ষেত্র হালিশহর
গঙ্গার পূর্বতীরে অবস্থিত হালিশহর এক অনন্য ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক জনপদ। বহু শতাব্দীর ইতিহাস, সাধক-সন্তের পদচারণা, টেরাকোটার শিল্পঐতিহ্য এবং গঙ্গাতীরের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব মিলিয়ে এই শহরকে বলা হয় ‘পঞ্চসতীর তীর্থক্ষেত্র’। জগদীশ্বরী, সিদ্ধেশ্বরী, শ্যামাসুন্দরী, রানী রাসমণি এবং সুধাংশুবালার স্মৃতিবিজড়িত আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার এই পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
হালিশহর নামটির উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। অনেকের মতে, ‘হবেলি সাহার’ শব্দ থেকেই ‘হালিশহর’ নামের জন্ম। মুঘল আমলের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক গ্রন্থ আইন-এ-আকবরি-তে ‘হাভেলী সাহার’ নামে একটি পরগনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা সাতগাঁও সরকারের অন্তর্গত ছিল। আবার ষোড়শ শতকের প্রখ্যাত কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর বিখ্যাত কাব্য চণ্ডীমঙ্গল-এ এই অঞ্চলের নামোল্লেখ করেন। ‘কুমারহট্ট’ নামটিও এই শহরের সঙ্গে জড়িত; গবেষকদের মতে, কোনও এক সময়ে এই নামেই অঞ্চলটি পরিচিত ছিল। ইতিহাসের নানা স্তর অতিক্রম করে আজকের হালিশহর সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে।
এই জনপদের সর্বাধিক পরিচিত স্থান হল সাধক রামপ্রসাদ সেন-এর জন্মভূমি রামপ্রসাদ ভিট। শাক্তধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন এখানেই জন্মগ্রহণ করেন এবং দেবী কালীর সাধনায় ব্রতী হন। তাঁর পঞ্চমুণ্ডির আসন আজও ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র। রামপ্রসাদের রচিত ভক্তিমূলক ‘রামপ্রসাদী’ গান বাংলা কীর্তন ও শাক্তসঙ্গীতে এক বিশেষ ধারা সৃষ্টি করেছে। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন। এই ভিটে শুধু একটি স্মৃতিসৌধ নয়, এটি বাঙালির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
রামপ্রসাদ ভিটের কাছেই গঙ্গার তীরে রয়েছে রামপ্রসাদ ঘাট। সন্ধ্যাবেলায় এখানে দাঁড়ালে নদীর বুকে সূর্যাস্তের রঙিন প্রতিচ্ছবি এক অপার্থিব অনুভূতি সৃষ্টি করে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে, শান্ত পরিবেশে কিছু সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ স্থান। গঙ্গার স্রোত আর মন্দিরঘণ্টার ধ্বনি মিলিয়ে এক অনন্য আবহ গড়ে ওঠে।
হালিশহরের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন নন্দকিশোর মন্দির। প্রাচীন টেরাকোটা অলংকরণে সজ্জিত এই মন্দির বাংলার গ্রামীণ শিল্পশৈলীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সূক্ষ্ম পোড়ামাটির নকশায় পৌরাণিক কাহিনি ও সামাজিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। একইভাবে বারেন্দ্র গলির প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো মন্দিরেও দেখা যায় মনোরম টেরাকোটার কাজ, যা অতীতের শিল্পকুশলতার পরিচয় বহন করে।
সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির এই শহরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরে জাগ্রত দেবী সিদ্ধেশ্বরীর পূজা হয়ে থাকে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানে মানত করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। উৎসবের সময় ভক্তসমাগমে মন্দির চত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে।
ভক্তি ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে চৈতন্য ডোবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানে ছিলেন বৈষ্ণব সাধক ঈশ্বর পুরী, যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-কে দীক্ষা দিয়েছিলেন। গুরুদর্শনের সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে চৈতন্য মাটিতে গড়িয়ে পড়েন এই কাহিনি স্থানীয় লোকবিশ্বাসে আজও জীবন্ত। সেই ঘটনার স্মৃতিবাহক হিসেবে স্থানটি পরে পুকুরে রূপান্তরিত হয় বলে কথিত আছে। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এখানে একটি মন্দির নির্মিত হয়, যা আজ বৈষ্ণব ভক্তদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
অষ্টাদশ শতকে নির্মিত রথতলা মন্দির, যা শ্রীকৃষ্ণ জিউ মন্দির নামেও পরিচিত, আটচালা শৈলীর এক উঁচু ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। প্রায় ষাট ফুট উচ্চতার এই মন্দিরের সম্মুখভাগে পোড়ামাটির পদ্মনকশা শোভা পায়। চারপাশে প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণ একসময় বৃহৎ ধর্মীয় কমপ্লেক্সের অংশ ছিল বলে অনুমান করা হয়। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও এই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে।
হালিশহরের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম স্বামী নিগমানন্দ পরমহংস। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্বামী নিগমানন্দ আশ্রম আজও সাধনা ও অধ্যাত্মচর্চার কেন্দ্র। পূর্বাশ্রমে নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে পরিচিত এই সাধকের জীবনে সুধাংশুবালা দেবীর অকালমৃত্যু গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাঁকে বৈরাগ্যের পথে পরিচালিত করে। সেই ইতিহাস হালিশহরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
গঙ্গাতীরের অন্যতম আকর্ষণ রানী রাসমণি ঘাট। নদীর ধারে অবস্থিত এই মন্দিরের গঠন অনেকটাই দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির-এর আদলে নির্মিত। বর্ষাকালে গঙ্গার জল মন্দিরের পাদদেশ স্পর্শ করে। দ্বিতল কক্ষে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণা কালীর বিগ্রহ ভক্তদের কাছে বিশেষ পূজিত। নিরিবিলি পরিবেশে একদিনের ভ্রমণ বা পিকনিকের জন্য এটি উপযুক্ত স্থান।
এছাড়া শহীদ পল্লীর ফুচকা গ্রাম হালিশহরের এক ভিন্ন স্বাদের পরিচয় বহন করে। এখানে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ফুচকা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। স্বল্প মূল্যে নানা স্বাদের ফুচকা পাওয়া যায়, যা স্থানীয় অর্থনীতির একটি অভিনব রূপ তুলে ধরে।
মা গোলোকেশ্বরী মন্দিরে দেবীর বিগ্রহের অর্ধাংশ মাটির নিচে প্রতিষ্ঠিত এই বৈশিষ্ট্য একে রহস্যময় আবহ দেয়। রামপ্রসাদ ভিটে যাওয়ার পথে দুটি প্রাচীন পঞ্চরত্ন শৈলীর মন্দির চোখে পড়ে, যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শন। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো বুড়ো শিব মন্দির স্থানীয়দের কাছে গভীর শ্রদ্ধার স্থান হিসেবে বিবেচিত।
সব মিলিয়ে হালিশহর শুধুই একটি শহর নয়; এটি ইতিহাস, সাধনা, শিল্প ও লোকবিশ্বাসের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। একদিনের সফরে এই তীর্থক্ষেত্র ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনপদ বাঙালির আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
