এসআইআর শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এবার কার্যত কাঠগড়ায় নির্বাচন কমিশন। নামের বানান, মধ্যনাম, বয়সের ফারাকের মতো বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে সফটওয়্যার নির্ভর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষকে যেভাবে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রবল অসন্তোষ প্রকাশ করলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
শুনানির শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের হয়রানির প্রসঙ্গ তুলে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। তিনি জানান, নামের বানান বা মধ্যনামের সামান্য অমিলের কারণে বহু প্রকৃত ভোটারকে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। এতে ভোটারদের বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তিনি জানান, রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতার জন্য ৮,৫০৫ জন আধিকারিক দিয়েছে এবং সেই তথ্য ই-মেল মারফত কমিশনকে জানানো হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত সফটওয়্যার নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আপনাদের সফটওয়্যার অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ বাঙালি পরিবারে ‘কুমার’ একটি সাধারণ মধ্যনাম। শুধু ‘কুমার’ বাদ পড়লেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে। এটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য?” বিস্ময়ের সুরে তিনি প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন,“কল্পনা করুন, শুভেন্দুনারায়ণ রায় যদি একজন ফেলো হন। ‘নারায়ণ’ তাঁর মধ্যনাম। তাঁকেও নোটিস পাঠানো হয়েছে!” বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, সফটওয়্যার এমনভাবে কাজ করছে যে বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক ৫০ বছর হলে ধরে নেওয়া হচ্ছে দাদু-নাতির সম্পর্ক। অথচ বাস্তবে তো অনেক ক্ষেত্রেই ২০-২৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়। বাস্তব সমাজ কাঠামোর সঙ্গে এই সফটওয়্যার একেবারেই মিলছে না। এমনকী ৫-৬ সন্তানের অভিভাবকদেরও নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রাজ্য সরকারের দেওয়া কর্মীদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান,“কর্মী দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের নামের তালিকা কোথায়? আমরা তো বলেছিলাম বাংলা জানেন এমন অফিসার প্রয়োজন।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জানান, জেলা ভিত্তিক তালিকা দেওয়া হয়েছে। যদিও কমিশনের আইনজীবী দাবি করেন, সেই তথ্য তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি। এই নিয়ে বিতর্ক এড়াতে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট বলেন,“এই বিষয়ে আমরা আর বিতর্ক চাই না। নাম, ডেজিগনেশন-সহ সম্পূর্ণ তালিকা না পেলে মুখ্যসচিবের হলফনামা চাইতে হবে।”
শুনানিতে মাইক্রো অবজারভারদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রধান বিচারপতি জানতে চান, এসআইআর প্রক্রিয়ায় মাইক্রো অবজারভারদের কাজ কী। কমিশনের তরফে জানানো হয়, তাঁরা ইআরও এবং এইআরও-দের সহযোগিতা করেন, কোনও সিদ্ধান্ত নেন না। এর পরেই প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন,“যদি রাজ্যের অফিসাররা যুক্ত হন, তাঁরাও মতামত দিতে পারবেন। এতে ইআরও-দের সিদ্ধান্ত আরও মজবুত হবে।”
আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, পিএসইউ থেকে নেওয়া বহু মাইক্রো অবজারভারদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গ্রুপ-ডি কর্মী বা কাস্টমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। অথচ রাজ্য গ্রুপ-বি অফিসার দিতে চাইছে।
কমিশনের আইনজীবীর পাল্টা বক্তব্য,
“আমরা ৩০০ জন গ্রুপ-বি অফিসার চেয়েছিলাম। পেয়েছি মাত্র ৮০ জন। বাকিরা গ্রুপ-সি ও অন্যান্য শ্রেণির।”
শুনানিতে আরও জানানো হয়, এখনও প্রায় ১৪ লক্ষ শুনানি বাকি রয়েছে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের শেষ দিন। কমিশনের দাবি, নতুন করে আসা ৮,৫০৫ জন অফিসারকে প্রশিক্ষণ না দিয়ে কাজে লাগানো কঠিন। এই যুক্তির প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, “ওঁরা কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। শুধু সাহায্য করবেন। যত বেশি লোক স্ক্রুটিনি করবে, ততই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।”
নামের বানান সংক্রান্ত নোটিস নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দাবি করেন, এই ক্ষেত্রে ডিফল্ট অবস্থান হওয়া উচিত ভোটারদের বাদ না দেওয়া। যদিও প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, এই মুহূর্তে আদালত এ ধরনের কোনও নির্দেশ দিতে পারছে না।
সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পরে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ৮,৫০৫ জন গ্রুপ-বি অফিসার মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করবেন এবং দায়িত্ব নেবেন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন ইআরও ও এইআরও বদলাতে পারবে এবং এই অফিসারদের মধ্য থেকেই উপযুক্তদের কাজে লাগাতে পারবে।
একই সঙ্গে আদালত জানিয়ে দেয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও অকারণ বাধা বরদাস্ত করা হবে না। তবে সফটওয়্যার-নির্ভর গণহারে নোটিস এবং বাস্তবতা-বিবর্জিত সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিশনের ভূমিকা যে গভীর প্রশ্নের মুখে, তা স্পষ্ট করে দিল এই শুনানি।
