আজকের দিনেতিলোত্তমা

আনন্দপুর কাণ্ডে গ্রেপ্তার মোমো সংস্থার ২ আধিকারিক। প্রশ্ন উঠছে দায়ী কারা?

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

   কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় মোমো কারখানা ও গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। ধৃতরা হলেন ‘ওয়াও মোমো’-র ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী। নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে নরেন্দ্রপুর এলাকা থেকেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে। ধৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শুক্রবারই তাঁদের বারুইপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে। ধারাবাহিক জেরার জন্য পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানাবে তদন্তকারী সংস্থা।

এর আগে মঙ্গলবার নরেন্দ্রপুরের এলাচি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ঘটনাস্থল সংলগ্ন ডেকরেটর সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাসকে। বুধবার তাঁকে বারুইপুর আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি ফের তাঁকে আদালতে তোলা হবে। তার আগেই পুলিশ জেরা করে কারখানা ও গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঘটনার দিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কারা ছিলেন এবং ওই রাতে কতজন কর্মী ভিতরে ছিলেন তা জানার চেষ্টা চালাচ্ছে।

শুক্রবার সকালেও ঘটনাস্থলের পরিবেশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হু হু করে বইছে ঠান্ডা হাওয়া, আর সেই হাওয়ার সঙ্গেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের পোড়া গন্ধ। বাতাস ভারী হয়ে আছে চামড়া পোড়ার তীব্র দুর্গন্ধে। নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ২৫ জনের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যাই যে চূড়ান্ত, তা বলার কোনও সুযোগ নেই। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ ছাই হয়ে পড়ে থাকতে পারেন এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। পুড়ে যাওয়া গুদামঘর, ঝলসানো জিনিসপত্রের মাঝেই চলছে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজ। চোখে জল আর বুকভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে এখনও অপেক্ষায় পরিবারগুলো। যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে শেষবার দেখার সুযোগটুকুও পেলেন না, তাঁদের জন্য এই অপেক্ষা আরও নিষ্ঠুর। যত মিসিং ডায়েরি জমা পড়ছে, তত মানুষের খোঁজ মিলছে না। মিলছে শুধু ছাই, আর মানুষের দেহের টুকরো-টুকরো অংশ

এই গ্রেপ্তারের আবহেই সামনে আসছে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন ভিতরে আটকে থাকা মানুষগুলো। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসছিল অসহায় আর্তনাদ, আর ফোনের এপার থেকে শেষবারের মতো প্রিয়জনের কণ্ঠ শুনছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তখনই বুঝে গিয়েছিলেন নিজের ভাই, নিজের স্বামী, নিজের বাবাকে আর কখনও দেখা হবে না। অথচ কিছুই করার ছিল না। এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে মৌসুমী হালদার ও সুনীল হাঁসদাদের মতো একাধিক পরিবারকে।

আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে তিন কর্মীর মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে ‘ওয়াও মোমো’। মৃতরা হলেন ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা রবিশ হাঁসদা, বারুইপুরের বাসিন্দা বাসুদেব হালদার এবং গড়িয়ার বাসিন্দা পঙ্কজ হালদার। অভিশপ্ত সেই রাতে স্ত্রী মৌসুমী হালদারের সঙ্গে দু’বার ফোনে কথা হয়েছিল পঙ্কজ হালদারের। আগুনে আটকে পড়ে বাঁচার আকুল আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি। মৌসুমী হালদারের কথায়, রাত তিনটে নাগাদ ফোন করে পঙ্কজ বলেন, তিনি আর বাঁচবেন না, ভিতরে আগুন ধরে গিয়েছে। ফোন কেটে যাওয়ার পর তিনি আবার ফোন করলে পঙ্কজ বলেন, আর মাত্র পাঁচ মিনিট, তার পর তিনি আর পরিবারের মাঝে থাকবেন না।

ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা রবিশ হাঁসদা ‘ওয়াও মোমো’-র গুদামে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন। বাড়িতে রয়েছে আড়াই মাসের দুধের সন্তান ও স্ত্রী। ঘটনার রাতে দাদাকে ফোন করেছিলেন রবিশ। সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারছেন না দাদা সুনীল হাঁসদা। তাঁর কথায়, ভোর তিনটে নাগাদ রবিশ ফোন করে বলেন, তিনি আজ মারা যাচ্ছেন, কোম্পানিতে আগুন লেগেছে এবং অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। নিজের স্ত্রী ও ছোট সন্তানের দায়িত্ব দাদার উপর রেখে যান তিনি।

এদিকে এখনও নিখোঁজ বারুইপুরের বাসিন্দা বাসুদেব হালদার। তাঁর ছেলে দয়াময় হালদার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, কারখানার একটি এক্সিট গেট থাকলেও সেখানে ডেকরেটর সংস্থার তরফে কাঠ ও বাঁশ ফেলে গেটটি পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। ফলে আগুন লাগার পর ভিতরে থাকা কর্মীরা বেরোতে পারেননি।

অগ্নিকাণ্ডের পর ‘ওয়াও মোমো’-র তরফে বিবৃতি দিয়ে দায় চাপানো হয়েছে পাশের ডেকরেটর সংস্থার উপর। সংস্থার দাবি, অনুমতি ছাড়া সেখানে রান্না করা হচ্ছিল এবং সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে দমকল ও ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ডেকরেটর সংস্থার গুদামের পশ্চিম দিকের তিনতলা বাড়ি থেকেই আগুনের উৎপত্তি হয়। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ডেকরেটরস কারখানা, গুদাম এবং মোমো কারখানায়।

ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও মৃতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি, থামেনি উদ্ধারকাজ। ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ২৫টি দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। সেগুলি একই ব্যক্তির নাকি একাধিক জনের তা এখনও স্পষ্ট নয়। আরও দেহাংশ উদ্ধারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেহাংশগুলির পরিচয় জানতে ডিএনএ ম্যাপিং শুরু করেছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই ২৭ জনের নামে নরেন্দ্রপুর থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়েছে।

নিখোঁজ ২৭ জনের পরিবারের সদস্যদের রক্তের নমুনা ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, নিহতদের সঠিক পরিচয় নির্ধারণে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মীয়-পরিজনরা এখনও দিন গুনছেন—কখন, কী খবর আসবে।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২১ জনের দেহাংশ কাঁটাপুকুর মর্গে পৌঁছেছে। প্রতিটি দেহাংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য। কারণ দেহ বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই রয়েছে শুধু পোড়া ছাই আর চিহ্নহীন দেহাংশ। পরিচয় নির্ধারণের একমাত্র ভরসা এখন বিজ্ঞান।

প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের রাতে কারখানা ও গুদামের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। আগুন লাগার পর ভিতরে থাকা কর্মীরা প্রাণপণে বেরোনোর চেষ্টা করলেও দরজা বন্ধ থাকায় তাঁরা ভিতরেই জীবন্ত দগ্ধ হন। শেষ মুহূর্তে অনেকে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে নিজেদের মৃত্যুর আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন।

এই ঘটনার পর একাধিক প্রশ্ন উঠছে কেন ভিতরে শ্রমিকদের রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? সেদিন কারখানা ও গুদামের দায়িত্বে কারা ছিলেন? ঠিক কতজন শ্রমিক ওই রাতে ভিতরে ছিলেন?

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বুধবার রাত থেকেই নাজিরাবাদের ঘটনাস্থলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে, যা বলবৎ থাকবে আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত। ঘটনাস্থলে বিজ্ঞপ্তি ঝোলানো হয়েছে। পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এলাকা ঘিরে দুটি স্তরে ব্যারিকেড করা হয়েছে এবং মোতায়েন রয়েছে বিপুল পুলিশ বাহিনী।

বৃহস্পতিবার সকালে আর্থ মুভার ও জেসিবি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় আরও চারটি দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে বলে খবর। ফলে দেহাংশ উদ্ধারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও পুলিশের তরফে এখনও নির্দিষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।

রোজকার মতোই কাজে এসেছিলেন মানুষগুলো। বাড়ির লোকেরাও ভেবেছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার দেখা হবে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বহু পরিবারের গোটা জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *